লাভানীর উপকথা

 মারাঠা লোক সংস্কৃতির একটি অন্যতম দ্রষ্টব্য হলো লাভানী। আদতে একটি চটুল নৃত্য শৈলী ছিল, যা সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। তার একটি রূপ মনোজ্ঞ, দার্শনিক ভাবনায় মোড়া গানের কথা। তবে অতীতের আদি শৈলী টিও কোথাও কোথাও অপরিবর্তিত থেকে গেছে। 

যখন কর্মসূত্রে বহু বছর আগে মহারাষ্ট্র এর মুম্বাই শহরে থাকতাম, তখন এক বন্ধুবর দাদা এবং সহকর্মী পেয়েছিলাম। তার মারুতি ৮০০ করে কোনো কোনো ছুটির দিনে প্রায় পঞ্চাশ ষাট কিলোমিটার দূরে গিয়ে কোনো এক গ্রামের গাওটি মুরগি আর বাকরি রুটি, জিজ্ঞা ভাজা খেতাম। মানে, দেশীয় মুরগি, চালের গুড়ি দিয়ে বানানো রুটি, ছোট চিংরি ভাজা। সামান্য সুধা, কখনো সখনো গলা ভিজিয়ে নেওয়ার জন্য। কিম্বা মালাওয়ালির গুহাচিত্র। এক আধবার তার সাথে এরকম সফরে কোথাও গিয়ে দেখি এলাকায় আঞ্চলিক মেলা চলছে। তাতে, লাভানি নাচের আসর বসেছে। সেই গ্রাম্য আসর গুলোতে আদিরসে ভরা গানের কথা, আর সরস নৃত্য, নিতান্তই আনন্দ দিত। গাছ পালা, নিচু পাথুরে পাহাড়ের মাঝে মাঠের ধারে সেই গান আর নাচ যেন সময়ের কাটা পেছনে ঘুরিয়ে নিয়ে চলে যেত বহু বহু বছর আগে। 

পেশোয়া সাম্রাজ্যের সময়কালে যখন মারাঠাদের প্রভাব প্রতিপত্তি প্রচন্ড, তখন তাদের সেনা বাহিনী বিভিন্ন দিকে যাত্রা করতো বছরের বিভিন্ন সময়ে। অন্যান্য রাজাদের সাথে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করা মূলতঃ প্রধান কারণ থাকতো। এছাড়াও বেগরবাই যারা তাদের শায়েস্তা করা। কিম্বা নতুন কোনো রাজ্যের সাথে চুক্তি। শুনেছিলাম, সেইসব বাহিনীর লম্বা যাত্রা, রণক্লান্ত শরীর, রিক্ত সিক্ত মন কে চাঙ্গা রাখার জন্য বাহিনীর সাথে গান বাজনার ব্যবস্থা থাকতো। সেই বাহিনীর আসর গুলো থেকেই লাভানী র সৃষ্টি। বিশেষ করে বৈঠাকিছি লভানী। তাই গানের মূল চরিত্রগুলি সচরাচর যোদ্ধা, তার স্ত্রী, তার যুদ্ধযাত্রা, তার বিভিন্ন কাল্পনিক প্রেমাক্ষান এইসব নিয়ে হত। 

লাভানির সন্ধেবেলার আসর বাহিনীর সেপাইদের মনের রসদ দিত। লম্বা যাত্রার দুঃখ কষ্ট গ্লানি, শান্ত পরিবারিক জীবনের আরামের থেকে দূরে থাকার বেদনা কে দূরে সরিয়ে রাখতো। 

দাবার বোর্ডের বোড়েদের দুঃখ কষ্ট গ্লানি  মন্দ এবং মন্দা - এইসব থেকে মন আর চোখকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার উপায় রাজা মন্ত্রীরা তৈরি করে দেয় বৈকি। 

এখনও তাই চলছে।

Comments

Popular posts from this blog

খিচুড়ি কথন